পাঠকপ্রিয় উপন্যাস তারাশঙ্করের কবি

মানুষের মহত্ত্বকে যিনি পরম যত্নের সঙ্গে তার রচনার মূল সুর করেছিলেন তিনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। সাহিত্যজীবনে তিনি ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধগ্রন্থ, ৪টি আত্মজীবনী এবং ২টি ভ্রমণ কাহিনী রচনা করেন যেগুলোর অধিকাংশই তার বাস্তব অভিজ্ঞতার রূপায়ণ।
বিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক হিসেবে তিনি পেয়েছেন পদ্মভূষণ, রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কারসহ একাধিক স্বীকৃতি।

তার রচিত কালজয়ী উপন্যাস “কবি” । কলেজে স্যার প্রায় সময়ই বলতেন যারা বইটি পড়োনি তারা পড়ে নিও। বইটা পড়ার পর আমার মনে একটি প্রশ্ন আছে ঘুরপাক খাচ্ছে “ গোবরে পদ্মফুল ” এই প্রবাদ বাক্যটির উদ্ভাবন কি এই উপন্যাসের পরেই হয়েছে ? প্রশ্নটা মনে জাগার পিছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও আছে । উপন্যাসটিতে নিম্নবর্গের দুধর্ষ ডাকাত বংশীয় একজন মানুষের কবি হয়ে ওঠার রোমাঞ্চকর ও চিত্তাকর্ষক কাহিনী পড়ে মনে এমন প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক।

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিতাইচরণের কবিপ্রতিভা এবং প্রণয়-আবেগ উপন্যাসটিকে পাঠকপ্রয়িতার শীর্ষে পৌঁছিয়েছে । যার বয়স বাড়লে মা বলে বংশের কাজে হাত লাগাতে , মামা বোঝাতে আসে এই কাজই তাকে করতে হবে । তবুও সে নিজেকে সব থেকে আলাদা রাখে, মদ থেকে দূরে , মিথ্যে থেকে দূরে , পরিবারের থেকেও দূরে সরে যায় ।
এই কবির নামই নিতাই । কবিগানে কবিয়াল হিসেবে আরেক কবির সাথে কবিতার যুদ্ধে নিজের নামের প্রসার করতে থাকে । তার পরম বন্ধু রেল স্টেশনের রাজা(রাজন) যে তার বাসস্থানের ব্যবস্থার সাথে পুঁজিরও ব্যবস্থা করে রেখেছে । কবি মানুষ প্রেমের উত্তাল সাগরে আত্মহুতি দিবে না তা কি হয় ? রাজনেরই ঠাকুরঝির প্রেমে পতিত হলো নিতাই । নিতাইয়ের চোখে সে “কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে?”  দিনগুলি ভালোই যাচ্ছিল । ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা দু’জনের এই প্রেমের সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। কারণ ঠাকুরঝি ছিলো বিবাহিত তাই হয়তো প্রেমের পূর্ণতা পায়নি। নিতাই নিজ প্রেমকে উৎসর্গ করে চলে যাওয়ার মুহূর্তে বন্ধুবর রাজন যখন তার শ্যালিকার বিয়ে নিতাইয়ের সঙ্গে দিতে উদ্যত হয় তখন নিতাই বলে, “মানুষের ঘর কি ভেঙ্গে দিতে আছে রাজন? ছি!” একবুক বেদনা ও সহজ সরল ঠাকুরঝিকে মনের গহীনকোণে চির আপন করে নিয়েই নিতাই বসন্তের ডাকে ঝুমুর দলে পাড়ি জমায়।

যেদিন ঝুমুর গানের দলকে তার বাড়িতে এনে রাজন উঠালো । এরপরে স্বাভাবিক জীবনের স্রোত পালটে গেলো । পুকুরেও যেন মহাসাগরের ঢেউ । নিতাই আস্তে আস্তে ঝুমুরের দলের সাথে মিশে গেলো এবং সে দলের বসন্তু নামে মেয়েটির সাথে গাঁটছাড়া বাঁধলো। বসন্তের সেই ফল্গুধারার মধ্যে নিতাই খুঁজে পেয়েছিল আবহমান বাংলার এক শাশ্বত নারী প্রতিকৃতি। তাইতো আত্মপরিচয় ভুলে সে বসন্তকে বাঁচিয়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু নিয়তির লিখন, মেয়েটি অসুস্থ হয়ে মারা যায়,তারপর নিতাই সেই দল ছেড়ে কাশি ঘুরে নিজ গ্রামে ফিরে আসে। গ্রামে যখন এসে শুনে ঠাকুরঝি তার জন্য পাগল হয়ে মারা গেছে। তখন তার পুরো জগৎ-সংসার ছোট হয়ে যায়। দুনিয়া তার কাছে তুচ্ছ হয়ে উঠে। তাইতো সে গেয়ে ওঠে-
“এই খেদ মোর মনে মনে,
ভালবেসে মিটল না আশ-কুলাল না এ জীবনে।
হায়! জীবন এত ছোট কেনে!
এ ভুবনে?”

সবচেয়ে ভালো লেগেছে কবিয়ালের নিতাইয়ের লিখা কিছু চরণ ।
তন্মধ্যে ভালোলাগার কয়েকটি চরণ কয়েকটি তুলে ধরলাম –
১. “ কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে ?
কালো চুলে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে ?”

২. “ এই খেদ আমার মনে ভালবেসে মিটল না সাধ , কুলাল না এ জীবনে!
হায় জীবন এত ছোট কেনে ? এ ভুবনে ?”

৩. “ চাঁদ তুমি আকাশে থাক আমি তোমায় দেখব খালি । ছুঁতে তোমায় চাইনাকো হে সোনার অঙ্গে লাগবে কালি ।”

সবমিলিয়ে উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ অবধি লেখকের গল্প বলার মধ্যে অসাধারণ এক পাঠকপ্রিয়তা ছিল । তাই আমার মনে হয়, বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটা তালিকা করলে তার মধ্যে তারাশঙ্করের কবি অন্যতম।

বই : কবি
লেখক : তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়
ধরণ : সামাজিক উপন্যাস
পৃষ্টা : ১৫২
প্রথম প্রকাশ : ১৯৪৪

রিভিউ লেখক: আকরামা আরিফ ইষা
অধ্যয়নরত, বাংলা বিভাগ
গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।

pakundia pratidin

Executive Editor - নির্বাহী সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *