বুধবার, ০৪ অগাস্ট ২০২১, ১০:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম:

করোনাকালীন অভিজ্ঞতা

মোঃ শফিকুল ইসলাম শফিক
  • Update Time : শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১
  • ১১২ Time View

মোঃ শফিকুল ইসলাম শফিক

গত ফেব্রুয়ারীর ১০ তারিখ কোভিড-১৯ প্রথম ডোজ টিকা নিলাম,টিকা নেওয়ার রাতে প্রচন্ড জ্বর আসে,কম্বল, লেপ দিয়েও শীত লাগতেছিলো,রাতেই নাপা এক্সট্রা খেয়ে নিলাম,ভোর রাতে জ্বর একটু থেমে গেল।পরদিন শক্রবার জ্বর জ্বর লাগছে,নাপা চালিয়ে যাই। শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত একটু একটু জ্বর আসে আর শরীর ব্যথা,ভাবলাম টিকার নেওয়ার জন্য হয়ত এমটি হচ্ছে,আমার সাথে আরো অনেকের একই মতামত,হয়ত টিকার রিএক্সাশান??
মঙ্গলবার জানতে পারলাম আমার অফিসের ৩জন সহকর্মী করোনায় আক্রান্ত,বুধবার কতৃপক্ষের নির্দেশে করোনা টেস্ট দিলাম।বৃহস্পতিবার সিভিল সার্জন অফিস থেকে জানানো হলো আমার কোরোনা পজিটিভ।

অফিসের ডাক্তারের পরামর্শ মতো ঔষধ খাওয়া শুরু করলাম,কিশোরগঞ্জ শহরে আলাদা রুমে আছি।
বাচ্চাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে আমি আর আমার স্ত্রী বাসায়,দুইজন দুই রুমে।
পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ড্রয়িংরুমের ভেসিনে হাতমুখ, দাঁত ব্রাশ করার জন্য গেলাম…. আর কিছু মনে নেই!! পরে শুনলাম আমি যখন সেন্সলেস হয়ে মেঝেতে পরে গেলাম আমার ওয়াইফ তখন ছিলো পাশের রুমে,কাজের মহিলা মাহমুদার মা চিৎকার দিয়ে নাকি আমার ওয়াইফকে বললো, “ভাইতো পরে গেছে”।

শুনলাম শুধু সেন্সলেস নয় দাঁতীও লেগেছিল এমনকি কাপড়ছোপর নষ্ট করে ফেলেছিলাম, আমি কিছুই বলতে পারিনা। যাক, আমার ওয়াইফ মাহমুদার মাকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলে,এইজন্য যে এটা ছোঁয়াছুঁয়ি রোগ,কিন্ত সে জীবনের মায়া ছেড়ে আমাকে সেন্স ফিরানো জন্য চেষ্টা করে অনেকক্ষন পর সফল হয় এবং আমার ছোটবোন শিরিনকে ফোনে আসতে বলে।

তারপর সোজা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিটে ভর্তি।
দীর্ঘ ৯ দিন হাসপাতালে ৫১১১ নং কেবিনে,ইতিমধ্যে আমার স্ত্রী পাপিয়া সুলতানা ও করোনা পজিটিভ!!!
কে কাকে সেবা করবো,একদিন রাত ২ টায় মনে হলো কিছুই খাওয়া হয়নি আমাদের, আমার তখন মনে হলো, না খেলেতো শক্তি হারিয়ে ফেলবো?? পাপিয়াকে ডেকে তুললাম,সে তখন খুবই কাতর,শ্বাসকষ্ট আছে!! তবু অনেক চেষ্টা করে খাওয়ার চেষ্টা করলাম দু’জনে ,এই শহরে আমার চার বোনের বসবাস,মা,বড় ছোট বোন,শ্বাশুড়ি নানান মজাদার খাবার পাঠায়,টেংরা মাছ,শুটকির তরকারি,দেশি মুরগির তরকারী আরো কত কি এগুলো আমার পছন্দের খাবার! চিকেন সুপ,বিভিন্ন ফল,কিন্ত কোন স্বাদ বা গন্ধ নেই,কখনো কয়লারমতো আবার কখনো খুবই তিতা লাগে খাবারে,খাইতে পারিনা,গোসল নেই ৭ দিন যাবৎ তাও মনে নেই,সাতদিন না একদিন গেল হাসপাতালে তা কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি।আমি সময় কিভাবে যায়,সকাল বিকাল কিছুই বুঝিনা।

কেমন যেন কষ্ট হয়,যখন ঘুমাই তখন মনে হয় আর জীবিত নাহলেই আরাম,ভালো হইতো।
জীবনের স্বাদ নেই,পৃথিবীর প্রতি মায়া নেই,সন্তান সহ আপনজনের প্রতিও মায়া নেই।
কে কে যেন আমাকে দেখতে গেলো মনে করতে পারিনা,মোবাইলে ফোন আসে,খুবই বিরক্তিকর লাগে,ধরিনা তবে চিন্তে পারি কে ফোন দিলো।
নয়দিনই দুইবার ডাক্তারের টিম আর সার্বক্ষণিক নার্সের তদারকি ভুলতে পারবোনা,নার্স প্রতিদিন নাভিতে একটা ইনজেকশন দিতো,অত্যান্ত দক্ষতারসহিত,খুঁজেই পাইতামনা,ঔষধগুলো সম্ভবত ১৫/১৬ টি সুন্দর করে একটি একটি করে আলাদা আলাদা ভাবে আমাদের টেবিলের কোনায় রেখে যেতো, যাতে ভুল না হয়।

একদিন বিভিন্ন পরীক্ষার সাথে সিটি স্ক্যান করানো হলো,রেজাল্ট মুটামুটি ভালো, তবে লাঞ্চে ইফেক্ট?? আমিতো ভয় পেয়ে গেলাম, ইতিপূর্বে আমার অফিসের একজন স্বনামধন্য মার্কেটিং ডাইরেক্টর ওবায়েদ স্যার করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারাগেছেন,আমি তখন শুনেছি লাঞ্চে আক্রান্ত হওয়া তিনি মারা গেছেন,আরো তিনজন সহকর্মীর মধ্যে খবর পেলাম একজন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিটিক্যাল অবস্থায় আছেন,আর দুইজন বাসায় থেকেই ভালোর দিকে।
যাক পাপিয়ার শরীর তেমন খারাপ হয়নি,সাতদিন পর আবারো করোনার টেস্ট দিয়েছি,আলহামদুলিল্লাহ করোনা নেগেটিভ এসেছে,নাগে ঘ্রাণ পাচ্ছি। অক্সিমিটারে বারবার চেক করি আমি,প্রায়ই ৯০/৯১ পাই,এটা জানি ৯০ এর নিচে হলেই অবস্থা খারাপ হবে,না ইনশাআল্লাহ ৯০ এর নিচে যায়নি।
তবে ৮ম দিনে কেন যেন বাঁচতে ইচ্ছে করেনা,সন্তান সহ কারো প্রতি মায়া বা আগ্রহ হয়না,একদম ভালো লাগেনা। মাথায় কিছুই ডুকেনা,কেমন আছন্ন ভাব!

আলহামদুলিল্লাহ ২৮ তারিখে আমার বাসায় যাওয়ার জন্য বলতেছিলো ডাক্তার, কিন্তু পাপিয়া কি এখনো পজেটিভ? পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে সকালে,সন্ধার পরপরই মোবাইলে মেসেজ করোনা নেগেটিভ।
তরিঘড়ি করে বড় বোনকে খবর দিলো আসতে,রাত ৮ টার মধ্যে বাসায় ফিরলাম।
অস্বস্তি কমেনা,মাথায় যে কি ঢুকছে কিছু ভালো লাগেনা। এখনো শরীর খুবই দূর্বল লাগে,খেতে ভালো লাগে,এখন আস্তে আস্তে সবই ভালো লাগছে।
আমার অফিসের কতৃপক্ষ, সহকর্মী যারা সাহস যুগিয়েছন,দোয়া করেছেন সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই,আর স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী সহ যারা আমার খবর নিয়েছেন, ফোন করেছেন,ধরতে পারিনি সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি,আমি বেঁচে আছি ইনশাআল্লাহ।

অনেকেই আমার কাছে জানতে চান,টিকা নেওয়ার পরেও আমি কেন আক্রান্ত হলাম,আসলে আমি সম্ভববত টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হই,আর টিকা নেওয়ায় একটা নির্দিষ্ট মেয়াদে কার্যকর হয়,ডোজও দুটি।
পরিশেষে একটা কথা বলবো,কারো শরীরে জ্বর বা শরীর ব্যথা হলে বিষয়টি সাধারণভাবে না নিয়ে সরকারী হাসপাতালে করোনা টেস্ট করুন,রেজাল্ট পজেটিভ আসলে সাথে সাথেই ঔষধ সেবন করলে আমার বিশ্বাস করোনায় কাবু করতে পারবেনা।
তাই অবহেলা নয়,সচেতন হতে হবে,মাক্স পড়ুন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
মোঃ শফিকুল ইসলাম শফিক
সভাপতি,
চরটেকী উচ্চ বিদ্যালয়,পাকুন্দিয়া কিশোরগঞ্জ।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০১৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এই ওয়েবসাইটের কোনো কনটেন্ট অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি
কারিগরি সহযোগিতায়: Ashraf Ali Sohan
www.ashrafalisohan.com