হাদীসের বর্ণনায় স্ত্রীকে ভালোবাসার উত্তম দৃষ্টান্ত
ইসলাম ও জীবন

হাদীসের বর্ণনায় স্ত্রীকে ভালোবাসার উত্তম দৃষ্টান্ত

হাদীসের বর্ণনায় স্ত্রীকে ভালোবাসার উত্তম দৃষ্টান্ত

আপনি যদি আপনার স্ত্রীর জন্য নিম্নোল্লিখিত হাদীসেরআবু যারএর মত উদার, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে আয়েশা (রা.) কে ভালোবাসতেন সেভাবে ভালোবাসতে পারেন তবে আপনিই হবেন আপনার স্ত্রীর উত্তম স্বামী ভালোবাসার যথাযোগ্য পাত্র 

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার (জাহেলী যুগে) এগারোজন মহিলা একত্রিত হয়ে প্রতিজ্ঞা করল যে, তারা তাদের স্বামীদের কোনো ভালমন্দ দোষত্রুটির কথা গোপন করবে না (অর্থাৎ তারা সব কথা বৈঠকে আলোচনা করবে)

প্রথমজন বলল:

আমার স্বামী উটের গোস্তের মত কঠোর; পাহাড়ের চুড়ার ন্যায় উঁচু, তার কাছে যাওয়া অনেক কঠিন (অহংকার অসদচরিত্রের কারণে), তার স্ত্রীরা অন্যান্যরাও তার সাথে মেলামেশায় কোনো লাভবান হয় না

দ্বিতীয়জন বলল:

আমার স্বামীর খবর আমি কাউকে জানাই না; কেননা যদি আমি তার দোষ বর্ণনা করি তবে সে আমাকে তালাক দিয়ে দিবে, ফলে আমি আমার সন্তান সন্তুতি হারাবো অন্য কথায় বলা যায় যে, যদি আমি তার দোষ ত্রুটি বর্ণনা করতে বসি তবে তার ছোট বড় কোনো দোষই বাদ দিব না তাই না বলাই ভালো

তৃতীয়জন বলল:

আমার স্বামী গভীর জলের মাছ নয়, অর্থাৎ তিনি মক্কার নিম্নভূমির মত সহজ সরল মানুষ, বেশি গরম না আবার বেশী ঠাণ্ডাও না, আবার বেশী পছন্দও না বেশী অপছন্দও না অর্থাৎ মধ্যপন্থী স্বভাবের

চতুর্থজন বলল: আমার স্বামী একজন নির্বোধ (দুশ্চরিত্র), যদি তার দোষ ত্রুটি বলি তবে সে আমাকে তালাক দিবে, আর যদি আমি চুপ থাকি তবে সে আমাকে তালাক না দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করবে

পঞ্চমজন বলল: আমার স্বামী যুদ্ধের ময়দানে শক্তি বীরত্বে বাঘের মত, তার দানশীলতা অতিথিপরায়ণতায় তিনি ঘরে কি আছে বা নেই সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করে না

ষষ্ঠজন বলল: আমার স্বামী অক্ষম, পথভোলা, বোকা রোগাটে যদি সে মারে তবে তোমাকে আহত বা শরীরের কোনো অংশ ভেঙ্গে ফেলবে বা দুটাই করবে

সপ্তমজন বলল: আমার স্বামী যদি খায় তবে পরিবারের কারো জন্য আর কিছু বাকি থাকে না, আর পরিবারের কেউ অসুস্থ বা অন্য কারণে কিছু চাইলে তারা পায় না

অষ্টমজন বললআমার স্বামীর স্পর্শ খরগোশের স্পর্শের ন্যায় নরম তুলতুলে, আর তার সুগন্ধী জারনাব (একপ্রকার সুগন্ধী বৃক্ষ) গাছের মত

নবমজন বলল: আমার স্বামী সম্ভ্রান্ত পরিবারের, উচ্চভূমির ন্যায় সে গঠনে লম্বা, অধিক দানশীল অতিথিপরায়ণ

দশমজন বলল: আমার স্বামী একজন সম্রাট; তিনি সম্রাটেরও সম্রাট, কেননা তার অনেকগুলো উট আছে যাতে আল্লাহ পাক অনেক বরকত দিয়েছেন, চারণক্ষেত্রে তেমন পাঠাতে হয় না, আর তারা যখনই বীণার আওয়াজ শুনে তখনই বুঝতে পারে যে তাদেরকে যবাই করা হবে, অর্থাৎ তিনি একজন  অতিথিপরায়ণ

এগারোতমজন বলল: আমার স্বামী আবু যার তার কথা আমি কি বলব সে আমাকে এত বেশী গহনা দিয়েছে যে, আমার কান ভারী হয়ে গেছে, আমার বাজুতে মেদ জমেছে এবং আমি এত সন্তুষ্ট যে, আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি সে আমাকে অত্যন্ত গরির পরিবার থেকে এনেছে, যে পরিবার ছিল শুধু কয়েকটি বকরীর মালিক সে আমাকে অত্যন্ত ধনী পরিবারে নিয়ে আসে, যেখানে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি এবং উটের হাওদার আওয়াজ এবং শস্য মাড়াইয়ের খসখসানি শব্দ শোনা যায় সে আমাকে ধনসম্পদের মধ্যে রেখেছে আমি যা কিছু বলতাম সে বিদ্রূপ করত না, আমি নিদ্রা যেতাম এবং সকালে দেরী করে উঠতাম আমি যখন পানি পান করতাম, তখন তৃপ্তি সহকারে পান করতাম

আর আবু যারয়ের মার কথা কি বলব! তার পাত্র ছিল সর্বদা পরিপূর্ণ এবং তার ঘর ছিল প্রশান্ত আবু যারয়ের পুত্রের কথা কি বলব! সেও খুব ভাল ছিল তার শয্যা এত সংকীর্ণ ছিল যে, মনে হত যেন কোষবদ্ধ তরবারি অর্থাৎ সে খুব হালকাপাতলা দেহের অধিকারী ছিল তার খাদ্য হচ্ছে ছাগলের একখানা পা আর আবু যারয়ের কন্যার কথা বলতে হয় যে, সে কতই না ভালো সে বাপমায়ের খুব বাধ্যগত সন্তান সে অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিরারিণী, যে কারণে সতীনরা তাকে হিংসা করে আবু যারয়ের ক্রীতদাসীরও অনেক গুণ সে আমাদের গোপন কথা কখনো ফাঁস করত না, সে আমাদের সম্পদের মিতব্যয়ী ছিল এবং আমাদের বাসস্থানকে আবর্জনা দিয়ে ভরে রাখত না

সে মহিলা আরও বললএকদিন দুধ দোহনের সময়ে আবু যার বাইরে এমন একজন মহিলাকে দেখতে পেল যে, যার দুটি পুত্র সন্তান আছে ওরা মায়ের স্তন্য নিয়ে চিতা বাঘের মত খেলছিল (দুধ পান করছিল) সে মহিলাকে দেখে আকৃষ্ট হল এবং আমাকে তালাক দিয়ে তাকে শাদী করল এরপর আমি এক সম্মানিত ব্যক্তিকে শাদী করলাম সে দ্রুতগামী অশ্বে অরোহণ করত এবং হাতে বর্শা রাখত সে আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে এবং প্রত্যেক প্রকারের গৃহপালিত জন্তু থেকে এক এক জোড়া আমাকে দিয়েছে এবং বলেছে: হে উম্মে যার! তুমি সম্পদ থেকে খাও, পরিধান কর উপহার দাও

মহিলা আরও বলল: সে আমাকে যা কিছু দিয়েছে, তা আবু যারয়ের একটি ক্ষুদ্র পাত্রও পূর্ণ করতে পারবে না

আয়েশা (রা.) বলেনরাসুলুল্লাহ (সা.) এরপর বলেন, “হে আয়েশা! আমি তোমার জন্য উক্ত আবু যারয়ের মত হবো

হাইসাম ইবনে আদিএর বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: “হে আয়েশা! আমি তোমার জন্য ভালোবাসা ওয়াদাপূরণে উক্ত আবু যারয়ের মত হবো, তবে বিচ্ছিন্নতা দেশান্তরে তার মত হবো না

তাবরানীর বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: “তবে সে (আবু যার) তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে, আমি তোমাকে কখনও তালাক দিবো না

নাসাঈ তাবরানীর অন্য বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন: “হে আল্লাহর রাসুলুল্লাহ (সা.) বরং আপনি আবু যারয়ের চেয়ে অধিক উত্তম

সূত্র: বুখারীহাদীস নং ৫১৮৯মুসলিমহাদীস নং ২৪৪৮নাসায়ী: হাদীস নং ৯০৮৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *