আজকের পত্রিকা

তাকবীরে তাশরীকের বিধি-বিধান

মুহাদ্দিস মাও:আজিম উদ্দিন বিন মজনু

ঈদ মুসলিম মিল্লাতের জন্য জাতীয় উৎসব ও জাতীয় সম্মেলনের দিন।এ দিনে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে সৌহার্দ আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।এ দিবসে ইসলাম মুসলমানদের উপর কিছু ওয়াজিব ও কিছু মুস্তাহাব বিধান প্রবর্তন করেছে।যেমন: ঈদুল ফিতরে দুই রাকাত ঈদের সালাত আদায় করা, সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে। আর ঈদুল আযহায় ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় করা, কুরবানি করা, তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব করা হয়েছে। তাকবীরে তাশরীক মহান আল্লাহর মহত্ব ঘোষণার এক অনন্য উপকরণ। তাকবীরে তাশরীক জিলহজ্ব মাসে পড়া হয়। নিম্নে তাকবীরে তাশরীকে বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

তাকবীরে তাশরীকে সংজ্ঞা:-
জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে আরাম্ব করে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত এই পাঁচদিন প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পরে যে নিদ্রিষ্ট তাকবীর বলা ওয়াজিব তাকে তাকবীরে তাশরীক বলা হয়। তাকবীরে তাশরীক হচ্ছে : ﺍَﻟﻠﻪُ ﺍَٔﻛْﺒَﺮُ، ﺍَﻟﻠﻪُ ﺍٔﻛْﺒَﺮُ، ﻻَ ﺍِٕﻟَﻪَ ﺍِٕﻻَّ ﺍﻟﻠﻪُ، ﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﺍَٔﻛْﺒَﺮُ، ﺍَﻟﻠﻪُ ﺍَٔﻛْﺒَﺮُ ﻭَﻟِﻠﻪ ﺍﻟﺤَﻤْﺪُ – বাংলা উচ্চারণ .. আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।

তাকবীরে তাশরীকের ইতিহাস:-
তাকবীরে তাশরীক কোন ঘটনা থেকে শুরু হয়েছে, তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন৷ তবে সহীহ আল-বুখারীর ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী রহ. মবসুত ও কাজীখান কিতাবদ্বয় থেকে ‘হেদায়া ’ কিতাবের ব্যাখ্যা গ্রন্থে নকল করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন তার পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানী করার জন্য মাটিতে শুয়ায়ে তার গলায় ছুড়ি চালাচ্ছিলেন, এমনই মূহুর্তে আল্লাহ তায়ালা হযরত জিবরাইল (আঃ) কে নির্দেশ দিলেন,একটি জান্নাতী দুম্বা নিয়ে দ্রুত হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কাছে পৌঁছার জন্য৷ তখন হযরত জিবরাইল (আঃ) খুবদ্রুত আসছিলেন৷ কিন্তু দূর থেকেই দেখতে পেলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন৷ তখন জিবরাইল আঃ আশংকা করলেন যে,তিনি পৌঁছার পূর্বেই বুঝি ইসমাইল আঃ জবাই হয়ে যাবেন৷ তাই তিনি ঘাবড়ে গিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠলেনঃ
ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻛﺒﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻛﺒﺮ
হযরত জিবরাইল (আঃ) এর তাকরীর পাঠ শুনে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলে উঠলেনঃ
ﻻﺍﻟﻪ ﺍﻻ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺍﻛﺒﺮ .
আর হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর তাকবীর শুনে এবং দুম্বা জবাই হতে দেখে হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলে উঠলেনঃ
ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻛﺒﺮ ﻭﻟﻠﻪ ﺍﻟﺤﻤﺪ
এভাবে তিনজনের যিকিরকে একত্রিত করে হয়েছে তাকবীরে তাশরিক।
ঈদের তাকবীর পাঠ করা ও তার সময়সীমা :
দুই ঈদে তাকবীর পাঠ করা অতি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। মহান আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟِﺘُﻜَﺒِّﺮُﻭﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﺎ ﻫَﺪَﺍﻛُﻢْ ﻭَﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺸْﻜُﺮُﻭﻥَ ‘আল্লাহ তোমাদেরকে যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন তার আলোকেই যেন তার বড়ত্ব বর্ণনা করতে পারো’ (বাক্বারাহ, ১৮৫)।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ও আবু হুরায়রা (রা.) যুলহিজ্জার প্রথম ১০ দিনে বাজারে গিয়ে তাকবীর পড়তেন। তাদের দেখে লোকজনও তাকবীর পড়ত।

ঈদুল ফিতরে শাওয়ালের চাঁদ দেখার সময় থেকে তাকবীর পড়া আরম্ভ হবে এবং ঈদের ছালাতে ইমাম আসা পর্যন্ত চলতে থাকবে। ছালেহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে যায়েদা বলেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, উরওয়া ইবনে যুবায়ের, আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান ও আবুবকর ইবনে আব্দুর রহমানকে ঈদুল ফিতরের রাতে জোরে জোরে মসজিদে তাকবীর পাঠ করতে শুনেছেন।
ﻋَﻦِ ﺍﺑْﻦِ ﻋُﻤَﺮَ ﺍٔﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﻐْﺪُﻭ ﺍٕﻟَﻰ ﺍﻟْﻤُﺼَﻠَّﻰ ﻳﻮْﻡَ ﺍﻟْﻔِﻄْﺮِ ﺍٕﺫَﺍ ﻃَﻠَﻌَﺖِ ﺍﻟﺸَّﻤْﺲُ، ﻓَﻴُﻜَﺒِّﺮُ ﺣﺘَّﻰ ﻳَﺎْٔﺗِﻲَ ﺍﻟْﻤُﺼَﻠَّﻰ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻌِﻴْﺪِ، ﺛُﻢَّ ﻳُﻜَﺒِّﺮُ ﺑِﺎﻟْﻤُﺼَﻠَّﻰ، ﺣَﺘَّﻰ ﺍٕﺫَﺍ ﺟَﻠَﺲَ ﺍﻻٕﻣَﺎﻡُ ﺗَﺮَﻙَ ﺍﻟﺘَّﻜْﺒِﻴْﺮَ .
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি ঈদুল ফিতরের দিন সূর্য উঠার সাথে সাথে ঈদগাহে যেতেন। ঈদগাহে যাওয়ার পথে তিনি তাকবীর পাঠ করতেন। ঈদগাহে পৌঁছার পরও তাকবীর পাঠ করতেন। অতঃপর যখন ইমাম এসে বসতেন, তখন তিনি তাকবীর পড়া বন্ধ করে দিতেন।

ঈদুল আযহার তাকবীর দুই ধরনের:
১. মুত্বলাক্ব বা সাধারণ তাকবীর, ২. মুকায়্যাদ বা নির্দিষ্ট সময়ে পঠিতব্য তাকবীর। তাকবীরে মুত্বলাক্ব যুলহিজ্জার চাঁদ দেখার পর থেকে তাশরীক (যুলহিজ্জার ১১, ১২ ও ১৩) এর শেষ দিন পর্যন্ত পাঠ করতে হবে। যেমনটি ইবনে ওমর ও আবু হুরায়রা (রা.) পাঠ করতেন। আর তাকবীরে মুকায়্যাদ আরাফার দিনের ফজর থেকে শুরু করে তাশরীকের শেষ দিনের আছর পর্যন্ত প্রতি ফরয ছালাতের পরে পরে পাঠ করবে।
ﻋَﻦْ ﻋَﻠِﻲٍّ ﺍَٔﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﻜَﺒِّﺮُ ﻣِﻦْ ﺻَﻼَﺓِ ﺍﻟْﻔَﺠْﺮِ ﻳَﻮْﻡَ ﻋَﺮَﻓَﺔَ ﺍِٕﻟَﻰ ﺻَﻼَﺓِ ﺍﻟْﻌَﺼْﺮِ ﻣِﻦْ ﺍٓﺧِﺮِ ﺍَٔﻳَّﺎﻡِ ﺍﻟﺘَّﺸْﺮِﻳﻖِ
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি আরাফার দিন ফজরের ছালাত থেকে তাশরীকের শেষের দিনের আছর ছালাত পর্যন্ত তাকবীর দিতেন।
ﻋَﻦْ ﻋُﻤَﺮَ ﺍَٔﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﻜَﺒِّﺮُ ﻣِﻦْ ﺻَﻼَﺓِ ﺍﻟْﻐَﺪَﺍﺓِ ﻳَﻮْﻡَ ﻋَﺮَﻓَﺔَ ﺍِٕﻟَﻰ ﺻَﻼَﺓِ ﺍﻟﻈُّﻬْﺮِ ﻣِﻦْ ﺍٓﺧِﺮِ ﺍَٔﻳَّﺎﻡِ ﺍﻟﺘَّﺸْﺮِﻳﻖِ
ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি আরাফার দিন ফজরের ছালাত থেকে তাশরীকের শেষের দিনের যোহর ছালাত পর্যন্ত তাকবীর দিতেন।

ﻋَﻦِ ﺍﺑْﻦِ ﻋَﺒَّﺎﺱٍ ﺍَٔﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﻜَﺒِّﺮُ ﻣِﻦْ ﺻَﻼَﺓِ ﺍﻟْﻔَﺠْﺮِ ﻳَﻮْﻡَ ﻋَﺮَﻓَﺔَ ﺍِٕﻟَﻰ ﺍٓﺧِﺮِ ﺍَٔﻳَّﺎﻡِ ﺍﻟﺘَّﺸْﺮِﻳﻖِ، ﻻَ ﻳُﻜَﺒِّﺮُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤَﻐْﺮِﺏِ : ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺍَٔﻛْﺒَﺮُ ﻛَﺒِﻴﺮًﺍ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺍَٔﻛْﺒَﺮُ ﻛَﺒِﻴﺮًﺍ، ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺍَٔﻛْﺒَﺮُ ﻭَﺍَٔﺟَﻞُّ، ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺍَٔﻛْﺒَﺮُ ﻭَﻟِﻠَّﻪِ ﺍﻟْﺤَﻤْﺪُ .
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি আরাফার দিন ফজরের ছালাত থেকে তাশরীকের শেষ দিন পর্যন্ত তাকবীর দিতেন। মাগরিবের ছালাতের পর আর তাকবীর দিতেন না। তার তাকবীরের শব্দগুলো ছিল ‘আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার ওয়া আজাল্লু, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ’।

যাদের উপর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব:- যাদের উপর নামাজ রোজা ফরজ তাদের উপর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব। প্রত্যেক বালিগ পুরুষ ,মহিলা, মুকীম, মুসাফির, গ্রামবাসী, শহরবাসী, জামায়াতের সাথে নামায পড়ুক বা একাকী পড়ুক প্রত্যেকের উপর একবার করে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে হবে। এক কথায় “মুকাল্লাফুন বিশ শারয়ী” এর উপর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব। আর এ তাকবীর পুরুষের জন্য প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর উচ্চ আওয়াজে পড়তে হয় এবং মহিলারা নিম্ন আওয়াজে পড়তে হয়।

ঈদুল ফিতরের তাকবীর এবং ঈদুল আযহার মুত্বলাক্ব তাকবীর পড়ার নির্ধারিত কোনো সময় নেই, নির্ধারিত কোন স্থান নেই। বরং যে কোন সময় যে কোন স্থানে- হাটে-বাজারে, রাস্তা-ঘাটে, দোকান-পাটে, মসজিদ-মাদরাসায়, গাড়ি-ঘোড়ায় সর্বত্র জোরে জোরে এই তাকবীর পাঠ করতে থাকবে।

আল্লাহ্ আমাদের ঈদুল আযহার গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব তাকবীরে তাশরীক যথাসময়ে সঠিকভাবে পড়ার তাওফিক দান করুক, আমিন।

মুহাদ্দিস মাও:আজিম উদ্দিন বিন মজনু।
ইমাম এন্ড খতিব; হ্যাটফিল্ড জামে মাসজিদ,আমেরিকা।

Nazmul
বার্তা সম্পাদক 01795995615
http://pakundiapratidin.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *